নির্বাসনের নোটবুক


________________________দৈচুরা

কাল হাওয়ার হালকা ঘ্রাণে পেরিয়ে যাই মরা নদীর মতো শহর,

এক জিউসীয় কুঠুরিতে ঢুকতেই বেজে ওঠে ‘দক্ষিণী সেতু’—
নামহীন এক ব্যান্ড, তবু তার সুরে বাজে পূর্বপুরুষের মৃদঙ্গ,
রেলগাড়ির মতো কাঁপে মাটি, আর আমার শিরায় ছুটে চলে ইতিহাস।

মঞ্চে ওঠে এক নকলবিহীন ছায়া,
গলায় বাঁশির মরুভাষা, পায়ের তালিতে জেগে ওঠে জনতার পদচিহ্ন।
সে যেন প্রতিধ্বনি-বাজ, যে মৃত কণ্ঠকে জীবিত করে তোলে
নিজের রক্তে।

কিন্তু রাষ্ট্রের চোখে সে পলাতক সুর,
তাকে হত্যা নামের এক গন্ধহীন অভিযোগে দেশ থেকে ছুড়ে ফেলা হয়েছে—
যেন প্রতিবাদের কণ্ঠই এখন রাষ্ট্রদ্রোহ।

আরেক পাশে বসে আছে লোককাহিনির কবি,
যে আমাকে একদিন ডাউনটাউনের নির্জনে বলেছিল,
"চিৎকার করো, যদি গলা কেটে না যায়!"
তার ক্যামেরায় রেকর্ড হয়েছিল
একটা নির্জন কবিতা—
এখন তা সাগরের তলদেশে হারিয়ে যাওয়া একটা শঙ্খমালা।

দেখা হয় স্মৃতির কোলাহলে বসবাসকারী শিল্পী
ঘাতক-বধিরতা নির্মূলের স্বপ্নদ্রষ্টা-র সঙ্গে।
তারা বলে যায় পুরনো সময়ের কথা,
যেন সিল্কের খামে রাখা চিঠি খুলে পড়ছে বাতাসে।

তবু প্রশ্ন জেগে থাকে—
দেশে কি তবে শুধু ঘূর্ণির পুতুলেরা থাকবে?
নাট্যমঞ্চের কণ্ঠ আর লোকপ্রেমিক ধ্বনি
সব কি এই শীতার্ত নিউইয়র্কে নির্বাসিত?

এখানে আজ ভাষাহীন বৈশাখ,
টাইম স্কয়ারে শত মুখে উচ্চারিত বাংলার গান—
মনে হয় আমি দেশেই আছি,
কিন্তু ঠিক দেশেও না।
শিকড়ে পানি নেই, তবু ডালে পাতার ঝঙ্কার।

একদা যারা ছিল বাসন মাজা হাতে,
আজ তারা লিখছে নাটকের দৃশ্যপট, আঁকছে চেতনার আলপনা।
স্মৃতির পাথর দিয়ে গড়া সভা বসছে,
যেখানে মাতৃভাষা আজ কেবল উৎসবের অন্তরা নয়,
প্রতিবাদের পদ্য।


দুঃখ নিয়ে আর কীই বা করি—

চিৎকার করি, চিৎকার করি—

তবু যেন এ শব্দ আটকে যায় এয়ারপোর্টে,
একটা ইমিগ্রেশন ডেস্কে থেমে যায় উচ্চারণ।

তবু আমরা গান গাই—
নিউইয়র্কের অলিগলিতে দাঁড়িয়ে বানাই এক ভাসমান বাংলাদেশ,
যার কোনো সাংবিধানিক মানচিত্র নেই,
তবু প্রতিটি স্পন্দনে
বেজে চলে নির্বাসিত জন্মভূমির সুর

Comments

Popular posts from this blog

“স্বর্গে যা নেই”

“আর কত?”